শিক্ষা-সাহিত্য-সমাজসংস্কারে অনন্য ইবরাহীম খাঁ, আজ ১৩২তম জন্মবার্ষিকী


joyjatra প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ২, ২০২৬, ১১:৫৫ অপরাহ্ন / ৩৬ পঠিত
শিক্ষা-সাহিত্য-সমাজসংস্কারে অনন্য ইবরাহীম খাঁ, আজ ১৩২তম জন্মবার্ষিকী

উপমহাদেশের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও সমাজসংস্কারক প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁর ১৩২তম জন্মবার্ষিকী আজ। শিক্ষা বিস্তার, সাহিত্যচর্চা, সমাজসংস্কার ও মানবকল্যাণে অসামান্য অবদানের জন্য টাঙ্গাইলসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হচ্ছে এই গুণী মনীষীকে।

১৮৯৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার বিরামদি গ্রামে, বর্তমানে শাহবাজ নগর নামে পরিচিত এলাকায়, জন্মগ্রহণ করেন ইবরাহীম খাঁ। জ্ঞান, শিক্ষা, সাহিত্য ও সমাজসেবাকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করে কর্মময় জীবনে তিনি রেখে গেছেন বহুমাত্রিক অবদান।

শিক্ষাক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান

১৯১৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে অনার্স ও এমএ এবং ১৯২৩ সালে আইনশাস্ত্রে বিএল ডিগ্রি অর্জন করেন ইবরাহীম খাঁ।

করটিয়ার জমিদার ওয়াজেদ আলী খান পন্নী (চাঁন মিয়া)র আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা ও ইবরাহীম খাঁর প্রচেষ্টায় ১৯২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় করটিয়া সাদত কলেজ। তিনি ছিলেন কলেজটির প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ এবং টানা ২২ বছর এ দায়িত্ব পালন করেন। অবিভক্ত বাংলা ও আসামে মুসলমানদের প্রতিষ্ঠিত প্রথম কলেজ হিসেবে তৎকালীন সময়ে সাদত কলেজ ‘বাংলার আলীগড়’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

দেশ বিভাগের পর সরকারের আমন্ত্রণে ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। এছাড়া মিরপুর সরকারি বাংলা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি এবং ১৯৪৮ সালে ভূঞাপুর কলেজ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে তিনি সরাসরি যুক্ত ছিলেন। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে ইবরাহীম খাঁ সরকারি কলেজ নামে পরিচিত।

শিক্ষা বিস্তারে তাঁর অবদান ছিল ব্যাপক। ভূঞাপুর পাইলট উচ্চবালক বিদ্যালয়, ভূঞাপুর বালিকা বিদ্যালয়, ভূঞাপুর আলিয়া ও হাফেজিয়া মাদ্রাসা, করটিয়া জুনিয়র গার্লস মাদ্রাসা এবং ঢাকার ধানমন্ডির কাকলী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নে তিনি ভূমিকা রাখেন।

সাহিত্যে রেখেছেন স্বতন্ত্র ছাপ

শিক্ষাবিদ পরিচয়ের পাশাপাশি ইবরাহীম খাঁ ছিলেন একজন শক্তিমান সাহিত্যিক। তাঁর লেখায় উঠে এসেছে বাংলার মাটি ও মানুষের জীবন, গ্রামীণ জনপদের ভাষা, মানবিক মূল্যবোধ, সমাজবাস্তবতা ও সংস্কারের প্রত্যয়।

তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘বাতায়ন’, ‘ইস্তান্বুল যাত্রীর পত্র’, ‘মানুষ’, ‘পাখির বিদায়’, ‘রাসূলের দেশে’, ‘কাফেলা’, ‘নসর পেয়াদা’, ‘বৌ বেগম’, ‘লিপি সংলাপ’, ‘কামাল পাশা’, ‘আনোয়ার পাশা’, ‘ঋণ পরিশোধ’, ‘আলু বোখারা’, ‘গল্পে ফজলুল হক’, ‘ইসলাম সোপান’, ‘ইসলামের মর্মকথা’, ‘খালেদার সমর স্মৃতি’, ‘শাহনামা’, ‘গল্প দাদুর আসর’ ও ‘ছোটদের মিলাদুন্নবী’।

ইংরেজি ভাষাতেও তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে ‘A Peep into Rebel Poet’, ‘To My Students’, ‘Anecdotes from Islam’ ও ‘Gleanings in Golden Fields’ উল্লেখযোগ্য। তাঁর ‘Anecdotes from Islam’ গ্রন্থটি ইন্দোনেশিয়ার স্কুলপাঠ্য হয় এবং মালয়ালাম ও ইন্দোনেশীয় ভাষায় অনূদিত হয়।

পেয়েছেন একাধিক সম্মাননা

শিক্ষা ও সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ইবরাহীম খাঁ ১৯৬৩ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৭৫ সালে তাঁকে বাংলা একাডেমির জাতীয় সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ১৯৭৭ সালে তিনি বাংলাদেশ সরকারের একুশে পদক লাভ করেন। একই বছর কায়কোবাদ সাহিত্য মজলিশ থেকেও তিনি গণসংবর্ধনা পান। এছাড়া ২০১৫ সালে বিশ্ব শিক্ষক দিবসের জাতীয় উদযাপন কমিটি তাঁকে মরণোত্তর ‘শ্রেষ্ঠ শিক্ষক’ সম্মাননায় ভূষিত করে।

১৯৩৮ সালে তাঁকে ‘খান বাহাদুর’ উপাধি দেওয়া হলেও তিনি পরাধীন দেশের সেই খেতাব গ্রহণ করেননি এবং ১৯৪৩ সালে তা বর্জন করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় সরকারি খেতাব ‘তমঘায়ে কায়েদে আজম’ ও ‘সিতারা-ই-ইমতিয়াজ’ বর্জনের ঘোষণাও দেন তিনি।

আলোকিত সমাজ গড়াই ছিল লক্ষ্য

বাঙালি মুসলমান সমাজের এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনপর্বে ইবরাহীম খাঁর আবির্ভাব। শিক্ষা, জ্ঞান, মানবিকতা ও মুক্তচিন্তার মাধ্যমে সমাজের পশ্চাৎপদতা দূর করার চেষ্টা করেছেন তিনি। তাঁর জীবন ও সাহিত্যকর্মে মুক্তবুদ্ধি, মানবিক মূল্যবোধ এবং সমাজসংস্কারের প্রত্যয় বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

নিজের জীবন ও সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে তাঁর একটি প্রত্যাশা আজও স্মরণীয়। তিনি চেয়েছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পরও প্রয়োজনীয় সময় পর্যন্ত তাঁর লেখাগুলো যেন সমাজে মানুষের কাজে লাগে।

শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও সমাজসংস্কারক হিসেবে ইবরাহীম খাঁর কর্ম ও আদর্শ আজও নতুন প্রজন্মকে শিক্ষা, মানবিকতা ও সমাজকল্যাণের পথে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জোগায়। টাঙ্গাইল তথা বাংলাদেশের শিক্ষা ও সাহিত্যাঙ্গনে তাঁর অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

১৩২তম জন্মবার্ষিকীতে এই মহান মনীষীর প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা।

রিপোর্টার joyjatra ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫৫ অপরাহ্ন
৩৬ পঠিত