সাংবাদিক সমাজের ঐক্য: বিভাজন নয়, পেশার মর্যাদা রক্ষায় এক কাতারে দাঁড়ানোর সময়


admin প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬, ৫:৩৩ অপরাহ্ন / ৪২ পঠিত
সাংবাদিক সমাজের ঐক্য: বিভাজন নয়, পেশার মর্যাদা রক্ষায় এক কাতারে দাঁড়ানোর সময়

সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়; এটি একটি মহান, দায়িত্বশীল ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট দায়িত্ব। সমাজের অসঙ্গতি, দুর্নীতি, অনিয়ম, বৈষম্য ও জনদুর্ভোগের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করেন সাংবাদিকরা। সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিয়ে জনগণের কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করাই সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার গুরুত্ব অপরিসীম। গণমাধ্যমকে প্রায়ই সমাজের দর্পণ বলা হয়, আর সাংবাদিকরা সেই দর্পণের রক্ষক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সাংবাদিকতা পেশাও নানা সংকট ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। পেশাগত অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা, কম বেতন, রাজনৈতিক ও করপোরেট চাপ, হামলা-মামলা, বিভাজন এবং সংগঠনগত দুর্বলতা সাংবাদিক সমাজকে ক্রমেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। এই বাস্তবতায় সাংবাদিকদের মধ্যে ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি অনুভূত হচ্ছে। সাংবাদিক সমাজের ঐক্য এখন শুধু একটি প্রত্যাশা নয়, বরং পেশার মর্যাদা, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

সাংবাদিকদের ঐক্য বলতে শুধু কোনো সংগঠনের ব্যানারে একত্র হওয়াকে বোঝায় না। ঐক্যের প্রকৃত অর্থ হলো—পেশাগত অধিকার, নিরাপত্তা, স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং সত্য প্রকাশের স্বার্থে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্মানের ভিত্তিতে একসঙ্গে কাজ করা। একজন সাংবাদিক যখন হামলা, মামলা, হয়রানি, হুমকি কিংবা পেশাগত চাপে পড়েন, তখন অন্য সাংবাদিকদের নৈতিক ও সাংগঠনিক সমর্থন তার সাহস ও মনোবল বাড়িয়ে দেয়। একজনের বিপদে অন্যজন পাশে দাঁড়ানোই পেশাগত সংহতির সবচেয়ে বড় উদাহরণ। কারণ সাংবাদিক সমাজ যখন বিভক্ত থাকে, তখন তাদের সম্মিলিত শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। আর ঐক্যবদ্ধ সাংবাদিক সমাজ অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারে।

পেশাগত অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রেও ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। দেশের বহু গণমাধ্যমকর্মী এখনও কম বেতন, অনিয়মিত ভাতা, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং নানা ধরনের প্রতিকূল কর্মপরিবেশের মধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন। অনেক সাংবাদিক বছরের পর বছর অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করেও কাঙ্ক্ষিত সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। এসব সমস্যা একা একজন সাংবাদিকের পক্ষে সমাধান করা কঠিন। প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ, সংগঠিত দাবি এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্ব। সাংবাদিক সংগঠনগুলোর কাজ শুধু নির্বাচন, পদ-পদবি কিংবা আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সংগঠনকে সাংবাদিকদের কল্যাণ, পেশাগত নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ, আইনি সহায়তা এবং অধিকার আদায়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।

সাংবাদিকদের মধ্যে রাজনৈতিক, মতাদর্শিক কিংবা ব্যক্তিগত মতপার্থক্য থাকতেই পারে। গণতান্ত্রিক সমাজে মতের ভিন্নতা স্বাভাবিক। কিন্তু পেশাগত অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্নে সেই ভিন্নতা যেন সাংবাদিক সমাজের ঐক্যকে দুর্বল না করে—এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একজন সাংবাদিকের রাজনৈতিক মত বা ব্যক্তিগত বিশ্বাস যাই হোক না কেন, তিনি যখন পেশাগত দায়িত্ব পালন করছেন, তখন তার নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় অন্য সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়ানো উচিত। মত আলাদা হতে পারে, কিন্তু পেশাগত অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্নে সাংবাদিকদের মধ্যে ন্যূনতম ঐক্য থাকা জরুরি।

সাংবাদিকতার বড় একটি অংশ মফস্বলভিত্তিক। জেলা, উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাংবাদিকরা নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সংবাদ সংগ্রহ করে মানুষের কথা তুলে ধরেন। অনেক সময় তারা স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক চাপ কিংবা বিভিন্ন প্রতিকূলতার মুখোমুখি হন। অথচ সুযোগ-সুবিধা, প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা ও আর্থিক সহায়তার ক্ষেত্রে মফস্বলের সাংবাদিকরা অনেক সময় পিছিয়ে থাকেন। জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের সাংবাদিকদের মধ্যে এই দূরত্ব কমানো জরুরি। রাজধানী ও মফস্বল—উভয় পর্যায়ের সাংবাদিকদের সমান পেশাগত মর্যাদা ও নিরাপত্তার দাবিতে একসঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন।

বর্তমান ডিজিটাল যুগে সংবাদ প্রকাশের গতি বহুগুণ বেড়েছে। অনলাইন নিউজ পোর্টাল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সংবাদ পরিবেশনের সুযোগকে বিস্তৃত করেছে। একইসঙ্গে বেড়েছে ভুয়া তথ্য, অপপ্রচার, গুজব ও তথ্য বিভ্রান্তির ঝুঁকি। দ্রুত সংবাদ প্রকাশের প্রতিযোগিতায় অনেক সময় তথ্য যাচাইয়ের বিষয়টি উপেক্ষিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা, তথ্য যাচাই এবং পেশাগত নীতিমালার প্রতি শ্রদ্ধা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাংবাদিক সমাজ যদি নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে পারে, তাহলে ভুল তথ্য ও অপপ্রচার মোকাবিলার পাশাপাশি গণমাধ্যমের প্রতি জনগণের আস্থাও আরও সুদৃঢ় করা সম্ভব।

সাংবাদিক সমাজে ঐক্য প্রতিষ্ঠার পথে রাজনৈতিক বিভাজন, ব্যক্তিগত স্বার্থ, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, পদ-পদবি নিয়ে প্রতিযোগিতা, সংগঠনগত কোন্দল এবং পেশাগত বৈষম্য গুরুত্বপূর্ণ বাধা হিসেবে দেখা যায়। কখনো কখনো পেশাগত স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে। এতে সাধারণ সাংবাদিকদের প্রত্যাশা ও অধিকার পিছিয়ে পড়ে। সাংবাদিকতায় নতুনদের প্রবেশ স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় হলেও পেশাগত প্রশিক্ষণ, নৈতিকতা, তথ্য যাচাই ও দায়িত্বশীলতার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। ঐক্য মানে সবাইকে একই মতের হতে হবে—এমন নয়। ঐক্য মানে ভিন্ন মতের মধ্যেও পেশাগত স্বার্থে একে অপরের প্রতি সম্মান ও সহযোগিতা বজায় রাখা।

সাংবাদিক সমাজের ঐক্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নেতৃত্বের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিক নেতাদের হতে হবে দায়িত্বশীল, দূরদর্শী, গণতান্ত্রিক ও পেশাবান্ধব। ব্যক্তিগত স্বার্থ, পদ-পদবি কিংবা দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সাংবাদিকদের ন্যায্য দাবি ও অধিকার রক্ষায় সবাইকে একটি বৃহত্তর পেশাগত প্ল্যাটফর্মে আনার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। নেতৃত্বের প্রকৃত সাফল্য শুধু পদে থাকার মধ্যে নয়; বরং সংকটের সময়ে সহকর্মীদের পাশে দাঁড়ানো, নবীনদের উৎসাহিত করা, প্রবীণদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো এবং সাংবাদিক সমাজের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা তৈরি করার মধ্যেই নেতৃত্বের সার্থকতা। কোনো সাংবাদিক হামলা, মামলা, হুমকি কিংবা পেশাগত হয়রানির শিকার হলে দ্রুত তার পাশে দাঁড়ানো, প্রয়োজনীয় আইনি ও সাংগঠনিক সহায়তার ব্যবস্থা করা সাংবাদিক নেতাদের অন্যতম দায়িত্ব হওয়া উচিত।

সাংবাদিক সমাজকে শক্তিশালী করতে হলে প্রবীণ ও নবীন সাংবাদিকদের মধ্যে একটি সুন্দর সেতুবন্ধন তৈরি করতে হবে। প্রবীণ সাংবাদিকদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের জন্য মূল্যবান সম্পদ। অন্যদিকে নবীন সাংবাদিকদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা, উদ্যম ও নতুন চিন্তাভাবনা গণমাধ্যমকে এগিয়ে নিতে পারে। তাই প্রজন্মের ব্যবধানকে বিভাজনের কারণ না বানিয়ে অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের সমন্বয় ঘটানো দরকার।

সাংবাদিকদের ঐক্যের পাশাপাশি সরকার ও গণমাধ্যম মালিকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। সাংবাদিকদের ন্যায্য বেতন, চাকরির নিরাপত্তা, কর্মপরিবেশ, প্রযোজ্য শ্রম অধিকার এবং পেশাগত নিরাপত্তার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। সাংবাদিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যথাযথ প্রতিকার নিশ্চিত করা জরুরি। একইসঙ্গে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের মালিকদেরও সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষায় দায়িত্বশীল হতে হবে।

সাংবাদিকতা একটি আস্থার পেশা। জনগণ যখন কোনো সংবাদ পড়েন, দেখেন বা শোনেন, তখন তারা তথ্যের সত্যতা ও সাংবাদিকের দায়িত্বশীলতার ওপর আস্থা রাখেন। সেই আস্থা ধরে রাখতে হলে সাংবাদিকদের নিজেদের মধ্যেও পেশাগত নৈতিকতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। সাংবাদিকের কলম যেন কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থের হাতিয়ার না হয়—এমন একটি পেশাগত পরিবেশ গড়ে তোলাই হওয়া উচিত সবার লক্ষ্য। একইসঙ্গে কোনো সাংবাদিক অন্যায়ভাবে আক্রান্ত হলে তার পাশে দাঁড়ানোও সাংবাদিক সমাজের নৈতিক দায়িত্ব।

সবশেষে বলা যায়, সাংবাদিকতা পেশার মর্যাদা, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা রক্ষায় সাংবাদিকদের ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। বিভেদ নয়—পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা, পেশাগত দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার ভিত্তিতে সাংবাদিক সমাজকে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে। মতপার্থক্য থাকবে, বিতর্ক থাকবে, ভিন্ন চিন্তা থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পেশাগত অধিকার, নিরাপত্তা, সত্য প্রকাশ এবং সাংবাদিকতার মর্যাদার প্রশ্নে সবাইকে একটি ন্যূনতম ঐক্যের জায়গায় আসতে হবে।

কারণ একজন সাংবাদিক একা একটি সংবাদ প্রকাশ করতে পারেন, কিন্তু ঐক্যবদ্ধ সাংবাদিক সমাজ একটি পেশার মর্যাদা রক্ষা করতে পারে। তাই সময় এখন বিভাজনের নয়, পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার। সময় এখন একে অপরকে ছোট করার নয়, বরং সহকর্মীর পাশে দাঁড়ানোর। সাংবাদিক সমাজ যত বেশি ঐক্যবদ্ধ হবে, তত বেশি শক্তিশালী হবে গণমাধ্যম; আর শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমই পারে জনগণের আস্থা ধরে রাখতে এবং গণতান্ত্রিক সমাজে সত্য ও জনস্বার্থের পক্ষে কার্যকর ভূমিকা রাখতে।

ঐক্য হোক পেশার শক্তি, সাংবাদিকতা হোক মানুষের আস্থার ঠিকানা।

লেখক:মোঃশাহজাহান বাশার-সম্পাদক ও প্রকাশক দৈনিক জনতার মতামত,সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক মনোবাধিকার প্রতিদিন

রিপোর্টার admin ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৩৩ অপরাহ্ন
৪২ পঠিত