বাবা জীবনের-প্রথম-ও-শেষ-আশ্রয়– শাহজাহান বাশার


admin প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬, ৪:২০ অপরাহ্ন / ৩৯ পঠিত
বাবা জীবনের-প্রথম-ও-শেষ-আশ্রয়– শাহজাহান বাশার

কিছু মানুষকে ভালোবাসতে হয় না, তাঁদের ভালোবাসা আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে থাকে। কিছু মানুষকে মনে করতে হয় না, তাঁরা আমাদের প্রতিটি নিঃশ্বাসের ভেতর নীরবে বেঁচে থাকেন। বাবা তেমনই একজন। ‘বাবা’—মাত্র দুটি অক্ষরের একটি শব্দ, অথচ এই ছোট্ট শব্দটির ভেতর লুকিয়ে থাকে একটি সন্তানের পুরো পৃথিবী। সেখানে থাকে নিরাপত্তা, শাসন, মায়া, নির্ভরতা, ত্যাগ আর এমন এক ভালোবাসা—যার কোনো হিসাব হয় না।

শৈশবে বাবাকে মনে হতো, তিনি বুঝি পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষ। তাঁর হাতটি মুঠোয় থাকলে রাস্তার ভয় থাকত না, অন্ধকারকে ভয় লাগত না, অপরিচিত মানুষকেও ভয় লাগত না। মনে হতো, বাবা পাশে থাকলে পৃথিবীর কোনো বিপদই আমাকে ছুঁতে পারবে না। তখন বুঝিনি—বাবার হাতটিও একদিন কাঁপবে। বুঝিনি, যে মানুষটি আমাদের আঙুল ধরে হাঁটতে শিখিয়েছেন, একদিন বয়সের ভারে তিনিই হয়তো আমাদের হাত ধরে হাঁটবেন।

জীবন সত্যিই বড় অদ্ভুত।

শৈশবে আমরা বাবার ছায়ার নিচে বড় হই। আর বড় হতে হতে একসময় সেই ছায়াটির মূল্য বুঝতে শুরু করি। তখন দেখি, বাবার নিজের জন্য খুব বেশি কিছু ছিল না। তাঁর চাওয়া-পাওয়ার তালিকাটি ছিল ছোট; সন্তানের চাওয়ার তালিকাটিই ছিল বড়। সন্তানের নতুন জামা দরকার—বাবা কিনে দিয়েছেন। পড়াশোনার খরচ দরকার—বাবা জোগাড় করেছেন। সন্তানের অসুখ—বাবার রাত কেটেছে নির্ঘুম। সন্তানের ভবিষ্যৎ—বাবার বর্তমানটুকু পর্যন্ত বিসর্জন নিয়েছে।

অথচ বাবার নিজের কষ্টের গল্প খুব কমই শোনা যায়।

বাবারা সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃশব্দ মানুষ। তাঁরা কাঁদেন, কিন্তু সন্তানের সামনে নয়। তাঁরা ভেঙে পড়েন, কিন্তু পরিবারকে বুঝতে দেন না। পকেট শূন্য থাকলেও সন্তানের প্রয়োজনের সময় মুখে হাসি রাখেন। নিজের শরীর খারাপ হলেও বলেন—‘আমি ভালো আছি।’

এই ‘ভালো আছি’ কথাটির ভেতরে কতটা না-বলা কষ্ট লুকিয়ে থাকে, তা আমরা অনেক সময় বুঝতেই পারি না।

আমরা বড় হতে থাকি। পড়াশোনা, চাকরি, সংসার, ব্যস্ততা—সবকিছু আমাদের ঘিরে ধরে। বাবার সঙ্গে কথা বলার সময় কমে আসে। তাঁর ফোনটা অনেক সময় ব্যস্ততার কারণে কেটে দিই। তাঁর একই গল্প বারবার শুনে বিরক্ত হই। তাঁর কিছু পুরোনো চিন্তাকে ‘সেকেলে’ বলে পাশ কাটিয়ে যাই।

কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখি—যে মানুষটি সারাজীবন আমাদের কথা শুনেছেন, তাঁর কথাগুলো শোনার জন্য আমরা কতটুকু সময় রেখেছি?

বাবা বয়সে বড় হন, কিন্তু সন্তানের কাছে তাঁর প্রয়োজন কখনো পুরোনো হয় না। বরং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বোঝা যায়—বাবার উপস্থিতি আসলে কত বড় আশীর্বাদ।

ঈদ এলে চারদিকে আনন্দের আয়োজন শুরু হয়। নতুন পোশাক, নতুন জুতা, পরিবারের জন্য কেনাকাটা, প্রিয়জনদের সঙ্গে দেখা—সবকিছুতেই থাকে উৎসবের আমেজ। কিন্তু এই আনন্দের ভিড়ে কখনো কখনো আমরা ভুলে যাই সেই মানুষটির কথা, যিনি আমাদের প্রতিটি ঈদকে আনন্দময় করার জন্য নিজের কত চাওয়া-পাওয়া বিসর্জন দিয়েছেন।

শৈশবের ঈদে হয়তো বাবা হাত ধরে বাজারে নিয়ে গেছেন। নিজের জন্য কিছু না কিনে সন্তানের জন্য পছন্দের পোশাকটি কিনেছেন। সন্তানের মুখে হাসি দেখেই তাঁর ঈদের আনন্দ পূর্ণ হয়েছে। তখন আমরা বুঝিনি। বড় হয়ে বুঝি—বাবার আনন্দ ছিল সন্তানের আনন্দের মধ্যেই।

তাই ঈদের দিনে বাবার পাশে বসার চেয়ে বড় কোনো আয়োজন হয়তো নেই। তাঁর হাতে হাত রেখে কিছুক্ষণ কথা বলা, তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে হাসা, তাঁর পুরোনো গল্প শোনা—এসবই হয়তো তাঁর কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় উপহার।

কারণ সময় কাউকে চিরকাল অপেক্ষা করায় না।

একদিন হয়তো ঘরে ফিরে দেখব, বাবার চেয়ারে কেউ বসে নেই। তাঁর চশমাটি টেবিলের ওপর পড়ে আছে। পাঞ্জাবিটা আলমারিতে ঝুলছে। বিছানার পাশে তাঁর পুরোনো জুতাজোড়া পড়ে আছে। সবকিছু ঠিক আগের মতোই আছে—শুধু মানুষটি নেই।

সেদিন ঘরটা একই থাকবে, অথচ ঘর আর ঘরের মতো লাগবে না।

সেদিন বাবার সেই বকুনিগুলো মনে পড়বে, যেগুলো একসময় বিরক্তির কারণ ছিল। মনে পড়বে তাঁর কড়া গলার কথাগুলো। মনে পড়বে—বাড়ি ফিরতে দেরি হলে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে। মনে পড়বে, অসুস্থ হলে রাত জেগে মাথার পাশে বসে থাকা সেই মানুষটিকে। মনে পড়বে, নিজের প্রয়োজন ভুলে সন্তানের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া সেই মানুষটির কথা।

আর বুকের ভেতর থেকে হয়তো একটি কথাই বেরিয়ে আসবে—

‘বাবা, আরেকবার যদি ডাকতে পারতে!’

কিন্তু সময় তখন কাউকে দ্বিতীয় সুযোগ দেয় না।

তাই বাবা বেঁচে থাকতে বাবাকে ভালোবাসুন। তাঁর পাশে বসুন। তাঁর সঙ্গে গল্প করুন। তিনি একই কথা বারবার বললেও বিরক্ত হবেন না। তাঁর হাতটা একটু শক্ত করে ধরুন। সুযোগ পেলে একদিন শুধু বলুন—‘বাবা, তোমার জন্যই আমি আজ এখানে।’

বিশ্বাস করুন, এই একটি বাক্য বাবার জীবনের সবচেয়ে বড় পুরস্কার হতে পারে।

পৃথিবীর সব সাফল্য, সম্পদ, পরিচয় আর ব্যস্ততার মাঝেও বাবার কাছে আমরা শেষ পর্যন্ত সেই ছোট্ট সন্তান, যে তাঁর হাত ধরে নিরাপদ বোধ করত। বয়স বাড়ে, মানুষ বদলায়, সময় বদলায়, পৃথিবী বদলায়—কিন্তু বাবার ভালোবাসার জায়গাটি বদলায় না।

হয়তো কোনো একদিন জীবনের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়েও হঠাৎ বাবার কথা মনে পড়বে। মনে হবে, কতদিন বাবার পাশে বসা হয়নি! কতদিন তাঁর সঙ্গে মন খুলে কথা বলা হয়নি! কতবার তাঁর ফোন ব্যস্ততার অজুহাতে কেটে দেওয়া হয়েছে! কতবার তাঁর ডাকে বিরক্তি দেখানো হয়েছে!

সেই অনুশোচনার চেয়ে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে?

তাই সময় থাকতে ভালোবাসুন। বাবা পাশে থাকলে তাঁর মূল্য বুঝুন। তাঁর কষ্টের কথা শুনুন। তাঁর ক্লান্ত চোখের দিকে তাকান। তাঁর হাতটি ধরে রাখুন।

কারণ পৃথিবী আমাদের অনেক কিছু দিতে পারে, কিন্তু বাবার জায়গাটি পূরণ করতে পারে না।

বাবা শুধু একজন অভিভাবক নন। বাবা আমাদের প্রথম শিক্ষক, প্রথম সাহস, প্রথম নিরাপত্তা, প্রথম আশ্রয়। জীবনের প্রতিটি কঠিন সময়ে অদৃশ্য এক শক্তির মতো তিনি আমাদের পাশে থাকেন। আমরা যত দূরেই যাই, যত বড়ই হই, যত পরিচয়ই অর্জন করি—বাবার কাছে আমরা তাঁর সন্তানই থেকে যাই।

আর তাই জীবনের সব পথ ঘুরে, সব সাফল্য পেরিয়ে, সব ব্যস্ততার শেষে মানুষ শেষ পর্যন্ত যে ঠিকানাটিতে ফিরে যেতে চায়, সেটি হলো বাবার ভালোবাসা।

বাবা মানে শুধু একটি সম্পর্ক নয়; বাবা মানে জীবনের প্রথম ও শেষ আশ্রয়।

পৃথিবী যতই বদলে যাক, সময় যতই দূরে নিয়ে যাক, মানুষের ভিড় যতই বাড়ুক—বাবার মতো আপন ঠিকানা আর কোথাও নেই।

বাবা থাকুন বা তাঁর স্মৃতি থাকুক—সন্তানের হৃদয়ে বাবার জায়গাটি চিরকাল অমলিন।

রিপোর্টার admin ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:২০ অপরাহ্ন
৩৯ পঠিত