রাজনীতি ও সামাজিক পরিচয়ের বাইরে তাঁর আরেক পরিচয় একজন সমাজসেবক, ত্যাগে গড়া মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর অনন্য পথচলা


admin প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ৮, ২০২৬, ১২:৩৬ অপরাহ্ন / ৪৩ পঠিত
রাজনীতি ও সামাজিক পরিচয়ের বাইরে তাঁর আরেক পরিচয় একজন সমাজসেবক, ত্যাগে গড়া মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর অনন্য পথচলা

মোঃ শাহজাহান বাশার

মানুষের জীবনের সাফল্যের সংজ্ঞা একেকজনের কাছে একেক রকম। কারও কাছে সাফল্য মানে বিপুল অর্থ, বাড়ি-গাড়ি কিংবা বিদেশের মাটিতে নিজের একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করা। কেউ আবার সাফল্যকে দেখেন মানুষের জন্য কিছু করার মধ্য দিয়ে। নিজের স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে অন্যের মুখে হাসি ফোটানো, নিজের অর্জনকে অন্যের ভবিষ্যৎ গড়ার কাজে ব্যয় করা এবং কোনো প্রতিদানের প্রত্যাশা ছাড়াই মানুষের পাশে দাঁড়ানো—এই পথটি নিঃসন্দেহে কঠিন। কারণ অর্থ উপার্জন করা যেমন পরিশ্রমের বিষয়, তেমনি অর্জিত অর্থ ও সামর্থ্য মানুষের কল্যাণে ব্যয় করার জন্য প্রয়োজন অন্যরকম এক মানসিকতার।

ত্যাগের সেই মানসিকতার এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী। কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ধান্যদৌল গ্রামের এই মানুষটি জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন প্রবাসে। নিউইয়র্কের ব্যস্ত নগরীতে জীবিকার প্রয়োজনে কখনো ট্যাক্সিক্যাব চালিয়েছেন, কখনো ফাস্টফুডের দোকানে কাজ করেছেন, আবার জীবনের একটি পর্যায়ে নির্মাণশ্রমিক হিসেবেও কঠোর পরিশ্রম করেছেন। বিদেশের মাটিতে নিজের জন্য একটি নিরাপদ ও স্বচ্ছল জীবন গড়ে তোলার সুযোগ তাঁর সামনে ছিল। কিন্তু তাঁর জীবনযাত্রার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো—প্রায় তিন দশক নিউইয়র্কে থেকেও নিজের জন্য সেখানে কোনো বাড়ি গড়ে তুলতে পারেননি। পরিবারকে দীর্ঘ সময় দেশে রেখেই প্রবাসের কষ্টকর জীবন পার করেছেন। আর সেই উপার্জনের একটি বড় অংশ ব্যয় করেছেন নিজের এলাকার মানুষের জন্য।

তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আজ হাজার হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। দরিদ্র ও অসচ্ছল পরিবারের সন্তানদের জন্য তৈরি হয়েছে শিক্ষার সুযোগ। চিকিৎসাসেবার অবকাঠামো তৈরিতে জমি দিয়েছেন। গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেছেন। ঈদগাহ, কবরস্থান ও মসজিদের উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছেন। ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ না করে মানুষের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এসব কারণে তাঁর পরিচয় কোনো একক রাজনৈতিক বা সামাজিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। বরং দল-মত, ধর্ম-বর্ণ ও শ্রেণিপেশার বিভিন্ন মানুষের কাছে তিনি একজন মানবিক ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন—এমনটাই স্থানীয়দের বক্তব্য।

তাঁর জীবনকে শুধু একজন প্রবাসীর সাফল্যের গল্প বলা যায় না। এটি এমন এক মানুষের গল্প, যিনি নিজের অপূর্ণতাকে অন্যের সম্ভাবনায় রূপ দিতে চেয়েছেন। নিজের যে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ হয়নি, সেই স্বপ্ন পূরণের পথ তৈরি করেছেন অন্যের সন্তানদের জন্য। নিজের জন্য যে বাড়ি হয়নি, মানুষের জন্য তৈরি করেছেন একের পর এক প্রতিষ্ঠান। নিজের আরামকে পেছনে রেখে মানুষের ভবিষ্যৎকে সামনে রেখেছেন।

১৯৬৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী ও মোসাম্মাৎ আশেদা খাতুন চৌধুরী দম্পতির ঘরে প্রথম সন্তান হিসেবে জন্ম নেন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী। একটি সাধারণ পরিবারে তাঁর বেড়ে ওঠা। ছোটবেলায় পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা ছিল না। জীবনের শুরুতেই আসে বড় আঘাত। ১৯৭৪ সালে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় তিনি হারান বাবা আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরীকে। ছয় সন্তানকে নিয়ে তাঁর মা আশেদা খাতুনকে এরপর কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সংসার চালাতে হয়।

শৈশবের সেই দিনগুলো তাঁকে জীবনের বাস্তবতা বুঝতে শিখিয়েছে। অর্থের অভাব কী, একটি পরিবারের সীমিত আয়ে কতটা হিসাব করে চলতে হয়, একটি সন্তানের শিক্ষার স্বপ্ন কীভাবে আর্থিক সংকটে থমকে যেতে পারে—এসব তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন চাচারা। কোনো রকমে চলেছে সংসার। কিন্তু সেই প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও পরিবার থেকে তিনি পেয়েছেন অন্যরকম এক শিক্ষা—সততার শিক্ষা, আদর্শের শিক্ষা এবং মানুষের জন্য কিছু করার শিক্ষা।

তাঁর বাবা ছিলেন শিক্ষক। ফলে শিক্ষার প্রতি পরিবারের একটি আলাদা অনুরাগ ছিল। কিন্তু একজন শিক্ষকের সীমিত আয়ে বড় পরিবার চালানো সহজ ছিল না। মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী নিজেও চেয়েছিলেন অনেক পড়াশোনা করবেন, উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করবেন। কিন্তু বাস্তবতা তাঁর স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পড়াশোনা বেশি দূর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। জীবিকার তাগিদে তাঁকে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে হয়।

উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর ১৯৮৩ সালে জীবিকার সন্ধানে কাতারে পাড়ি জমান তিনি। দীর্ঘ প্রবাসজীবনের শুরু সেখান থেকেই। প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর পর দেশে ফেরেন। পরে জীবনের আরেক অধ্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান এবং নিউইয়র্কে কঠোর পরিশ্রমের জীবন শুরু করেন।

প্রবাসে গিয়ে তিনি কাজকে কখনো ছোট করে দেখেননি। ট্যাক্সিক্যাব চালানো থেকে শুরু করে ফাস্টফুডের দোকানে কাজ কিংবা নির্মাণশ্রম—যে কাজ পেয়েছেন, সেটিই করেছেন। লক্ষ্য ছিল উপার্জন করা, পরিবারকে সহায়তা করা এবং ভবিষ্যৎ গড়া। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাঁর চিন্তার পরিধি আরও বড় হয়েছে। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা তাঁকে বুঝিয়েছে, অর্থ শুধু নিজের প্রয়োজন পূরণের জন্য নয়; মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার মাধ্যমও হতে পারে।

নিজের উচ্চশিক্ষার অপূর্ণতা তাঁকে বারবার ভাবিয়েছে। তিনি উপলব্ধি করেছেন, একটি দরিদ্র পরিবারের সন্তান যদি ভালো শিক্ষা পায়, তাহলে শুধু একজন মানুষের জীবন নয়, পুরো একটি পরিবার বদলে যেতে পারে। আর একটি এলাকায় শিক্ষার সুযোগ তৈরি হলে বদলে যেতে পারে একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ। এই উপলব্ধি থেকেই তাঁর মধ্যে জন্ম নেয় শিক্ষা বিস্তারের স্বপ্ন।

১৯৮৮ সালে দেশে ফিরে গ্রামের মানুষের প্রয়োজনের কথা চিন্তা করে ঈদগাহ ও কবরস্থান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। পরের বছর ১৯৮৯ সালে বাবার স্মৃতিকে ধারণ করে প্রতিষ্ঠা করেন আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে বলে জানা যায়। যে বাবার সংসারে সীমাবদ্ধতার কারণে সন্তানের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ হয়নি, সেই বাবার নামেই পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠিত হলো এমন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যেখানে এলাকার শত শত সন্তান শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে—এই বিষয়টি মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর জীবনের একটি প্রতীকী অধ্যায়।

এরপর থেমে থাকেননি তিনি। ১৯৯৪ সালে মা ও দাদির নামে প্রতিষ্ঠা করেন আশেদা-জোবেদা ফোরকানিয়া মাদ্রাসা। পাঁচ বছর পর, ১৯৯৯ সালে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা সদরে প্রতিষ্ঠা করেন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ। বর্তমানে প্রায় চার হাজার শিক্ষার্থী সেখানে পড়াশোনা করছে বলে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জানা যায়। শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলিয়ে প্রায় একশ মানুষ এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। বিভিন্ন বিষয়ে অনার্স এবং একটি বিষয়ে মাস্টার্স পর্যায়ে পড়াশোনার সুযোগও রয়েছে।

একই বছর তিনি উপজেলা সদরে প্রতিষ্ঠা করেন আবদুল মতিন খসরু মহিলা ডিগ্রি কলেজ। নারী শিক্ষার প্রসারে এই প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে স্থানীয়রা মনে করেন। বর্তমানে সেখানে পাঁচ শতাধিক ছাত্রী পড়াশোনা করছে বলে জানা যায়। এর তিন বছর পর, ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন মুমু-রোহান চাইল্ড কেয়ার প্রি-ক্যাডেট কিন্ডারগার্টেন। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানেও তিন শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে।

একটি-দুটি নয়—একই এলাকার জন্য পাঁচটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পেছনে যে শ্রম, অর্থ, সময় ও মানসিক শক্তি প্রয়োজন, তা সহজে অনুমান করা যায়। এসব প্রতিষ্ঠানে সম্মিলিতভাবে প্রায় ছয় হাজার শিক্ষার্থী শিক্ষা গ্রহণ করছে বলে জানা যায়। একজন মানুষের ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি অঞ্চলের শিক্ষা অবকাঠামোতে এমন দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী।

তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ফলাফলও একসময় আলোচনায় আসে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের ফলাফলে মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ সেরা দশটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জায়গা করে নেয়। ২০১৮ সালেও তাঁর প্রতিষ্ঠিত কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উল্লেখযোগ্য ফলাফল দেখা যায়। ওই বছর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ও আবদুল মতিন খসরু মহিলা ডিগ্রি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে শতভাগ পাস এবং আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়ে ৯৮ শতাংশ পাসের হার ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পেছনে তাঁর উদ্দেশ্য কেবল সংখ্যার হিসাব নয়। তিনি বারবার বলেছেন, তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল এলাকার দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের জন্য শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা। নিজের জীবনে যে অভাবের কারণে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ হয়নি, অন্য কোনো শিশুকে যেন একই কারণে থেমে যেতে না হয়—এই ভাবনাই তাঁকে তাড়িত করেছে।

শিক্ষার প্রতি এই দায়বদ্ধতা তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্যের সঙ্গেও যুক্ত। ১৯৩৭ সালে তাঁর দাদা মরহুম সিরাজ খান চৌধুরী নিজ গ্রামে ধান্যদৌল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শুধু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেই তিনি দায়িত্ব শেষ করেননি; প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বও পালন করেছিলেন। তাঁর বাবা মরহুম আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরীও শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে কাজ করেছেন। ১৯৫৭ সালে দুর্গম রাঙামাটি এলাকায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি এবং নিজ এলাকা থেকে শিক্ষক নিয়ে গিয়ে সেখানে চাকরির ব্যবস্থা করেছিলেন।

অর্থাৎ মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর শিক্ষা বিস্তারের কাজকে বিচ্ছিন্ন কোনো উদ্যোগ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না। এর পেছনে রয়েছে কয়েক প্রজন্ম ধরে চলে আসা শিক্ষার প্রতি দায়বদ্ধতা। দাদা যে প্রদীপ জ্বালিয়েছিলেন, বাবা যে আলো দূরবর্তী এলাকায় পৌঁছে দিয়েছিলেন, পরবর্তী প্রজন্মে সেই আলো আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা করেছেন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী।

তাঁর কর্মকাণ্ড অবশ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই থেমে নেই। ২০১০ সালে ব্রাহ্মণপাড়া ডায়াবেটিক হাসপাতাল নির্মাণের জন্য তিনি এক বিঘা জমি দান করেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, ওই জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা। নিজের উদ্যোগে দুটি গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেছেন। ঈদগাহ, কবরস্থান ও মসজিদের উন্নয়নেও সহযোগিতা করেছেন।

দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের কথা মাথায় রেখে প্রতিষ্ঠা করেছেন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী ফাউন্ডেশন। এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তাঁর চিন্তা ছিল খুব সরল—অর্থের অভাবে কোনো মেধাবী শিক্ষার্থীর শিক্ষা যেন থেমে না যায়।

তাঁর সমাজসেবার আরেকটি দিক স্থানীয় মানুষের কাছে বিশেষভাবে আলোচিত—ধর্মীয় সম্প্রীতির প্রশ্নে তাঁর অবস্থান। ব্রাহ্মণপাড়া শ্রী শ্রী কালীমন্দিরের সংস্কারের সঙ্গে জড়িত একটি ঘটনা স্থানীয়দের কাছে তাঁর মানবিকতার উদাহরণ হয়ে আছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় মন্দিরটি জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে ছিল। সংস্কারের প্রয়োজন দেখা দিলে মন্দির প্রাঙ্গণের প্রায় শতবর্ষী একটি গাছ বিক্রি করে সেই অর্থ সংস্কারকাজে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিষয়টি জানতে পেরে মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী মন্দির কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি গাছটি এক লাখ টাকায় কিনে নেন এবং পরে সেটি আবার মন্দির কর্তৃপক্ষের কাছেই দান করে দেন।

ঘটনাটি আর্থিক মূল্যের বিচারে যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এর মানবিক ও সামাজিক তাৎপর্য। ধর্ম আলাদা হলেও মানুষের প্রয়োজন যে আলাদা নয়, মানুষের উপাসনালয় ও ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখানো যে সামাজিক সম্প্রীতির অংশ—এই ঘটনাটি তারই একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে স্থানীয়দের কাছে বিবেচিত।

এ কারণেই তাঁর পরিচয় কোনো একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের প্রয়োজনকে সামনে রেখে কাজ করার কারণে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের কাছেই তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়দের বক্তব্য।

প্রবাসজীবনের সঙ্গে তাঁর দেশের কাজের সম্পর্কটিও গভীর। নিউইয়র্কে বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করে যে অর্থ উপার্জন করেছেন, তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দেশে পাঠিয়েছেন বিভিন্ন সামাজিক ও শিক্ষা কার্যক্রমে। প্রবাসের আরামদায়ক জীবন বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকলেও তাঁর জীবনযাত্রা ছিল অনেক বেশি সংযমী।

প্রায় তিন দশক নিউইয়র্কে থাকার পরও সেখানে নিজের কোনো বাড়ি না থাকার বিষয়টি তাই অনেককে ভাবায়। একজন প্রবাসী হিসেবে নিজের জন্য সম্পদ গড়ে তোলার সুযোগ তাঁর ছিল। কিন্তু তিনি সেই পথে এগোননি। বরং দেশে তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোই হয়ে উঠেছে তাঁর বড় বিনিয়োগ।

স্ত্রী-সন্তানদেরও তিনি দীর্ঘ সময় দেশে রেখেছেন। বিদেশে পরিবার নিয়ে থাকলে জীবন হয়তো অনেকটা সহজ ও আনন্দময় হতে পারত। কিন্তু তাতে ব্যয় বাড়ত, আর দেশে চলমান সামাজিক কর্মকাণ্ডেও প্রভাব পড়ত। তাই একা মেসে থেকে কষ্টকর প্রবাসজীবন কাটিয়েছেন তিনি।

এই সিদ্ধান্তের পেছনে তাঁর পরিবারেরও ত্যাগ রয়েছে। স্ত্রী ফয়জুন নাহার চৌধুরী পিনু এবং দুই সন্তান নওশীন তাবাসসুম খান চৌধুরী ও ফারহান খান চৌধুরীর প্রতি তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তাঁর সামাজিক কর্মকাণ্ডে পরিবারের সদস্যরা মানসিকভাবে তাঁকে উৎসাহ ও সহযোগিতা করে আসছেন বলে জানান তিনি।

একজন মানুষের সামাজিক কর্মকাণ্ডের পেছনে পরিবার কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তাঁর জীবন তারও একটি উদাহরণ। কারণ তিনি একা ত্যাগ করেননি; তাঁর পরিবারের সদস্যরাও ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের অনেক কিছু ছেড়ে তাঁর স্বপ্নের পাশে থেকেছেন।

মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর রাজনৈতিক পরিচয়ও রয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ ধারণ করেন তিনি এবং শেখ হাসিনার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে নিজেকে দেখেন।

তবে তাঁর দীর্ঘ সামাজিক কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—মানুষের জন্য কাজ করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়কে তিনি সামনে রাখেননি—এমনটাই তাঁর কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন উদাহরণ থেকে প্রতীয়মান হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, মন্দির, মসজিদ কিংবা দরিদ্র শিক্ষার্থীর সহায়তা—মানুষের প্রয়োজন যেখানে, সেখানেই তাঁর উদ্যোগের উপস্থিতি দেখা যায়।

তাঁর অগ্রযাত্রায় বিভিন্ন সময়ে যাঁরা উৎসাহ ও সহযোগিতা করেছেন, তাঁদের তিনি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন। তাঁদের মধ্যে সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর খান চৌধুরী, দাদা জাকির খান চৌধুরী এবং সহধর্মিণী ফয়জুন নাহার চৌধুরী পিনুর নাম উল্লেখ করেন তিনি।

তবে শেষ পর্যন্ত কোনো পদ-পদবি দিয়ে মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর জীবনকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। কারণ তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর কর্মকাণ্ডে।

তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি বিদেশের মাটিতে শ্রম দিয়েছেন, কিন্তু সেই শ্রমের ফল নিজের শিকড়ের মানুষের জন্য ব্যয় করেছেন। তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের উচ্চশিক্ষার অপূর্ণতা থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বপ্ন দেখেছেন। নিজের জন্য বাড়ি করতে না পারলেও মানুষের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি তৈরি করেছেন। নিজের সন্তানদের বিদেশে নিয়ে গিয়ে স্বচ্ছল জীবনযাপন করার পরিবর্তে দেশের মানুষের জন্য কাজকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।

তাঁর জীবনের এই গল্পে সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয় একটি বিষয়—নিজের জন্য তিনি যতটা অর্জন করতে পারতেন, তার চেয়ে অনেক বেশি চেষ্টা করেছেন অন্যদের জন্য কিছু করার।

একজন মানুষের প্রকৃত সম্পদ কত টাকা, কত জমি কিংবা কতটি বাড়ি—এই প্রশ্নের বাইরে তাঁর জীবন আমাদের আরেকটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। একজন মানুষ চলে যাওয়ার পর তাঁর রেখে যাওয়া কী থাকবে? যদি থাকে মানুষের মুখে কৃতজ্ঞতার কথা, শিক্ষার্থীদের অর্জন, প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এবং মানুষের জীবনে তাঁর অবদানের স্মৃতি—তবে সেটিই কি সবচেয়ে বড় সম্পদ নয়?

মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর ক্ষেত্রে সেই সম্পদের তালিকা দীর্ঘ। তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়া শিক্ষার্থীদের সংখ্যা হাজার হাজার। তাঁর উদ্যোগে তৈরি হয়েছে চিকিৎসা ও সামাজিক অবকাঠামো। দরিদ্র শিক্ষার্থীরা পেয়েছে সহায়তা। বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি। আর সবচেয়ে বড় কথা, তাঁর কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে একটি বার্তা স্পষ্ট হয়েছে—মানুষের জন্য কাজ করার ক্ষেত্রে বিভাজনের চেয়ে মানবিকতাই বড়।

আজকের সময়ে যখন ব্যক্তিগত সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে অর্থ ও সম্পদের হিসাব সামনে আসে, তখন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর জীবন অন্যরকম একটি উদাহরণ সামনে আনে। তিনি দেখিয়েছেন, বিদেশে থেকেও দেশের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা যায়। নিজের জন্য কম রেখে অন্যের জন্য বেশি করা যায়। প্রবাসের কঠিন শ্রমকে দেশের মানুষের ভবিষ্যৎ নির্মাণের কাজে লাগানো যায়।

তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও সেই ধারাবাহিকতার অংশ। প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও মানসম্মত ও আধুনিক করতে চান তিনি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ, প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য কাজ করতে চান। তাঁর কাছে সমাজসেবা কোনো একদিনের কর্মসূচি নয়; এটি জীবনব্যাপী একটি দায়িত্ব।

তিনি বলেছেন, মূলত বাবার স্কুল গড়ার স্বপ্নকে একে একে বাস্তবে রূপ দিয়ে চলেছেন। সমাজসেবার এই ব্রত অব্যাহত রাখতে পারলেই তিনি স্বস্তি পাবেন।

এই একটি কথার মধ্যেই যেন তাঁর দীর্ঘ জীবনের দর্শনটি ধরা পড়ে।

কারণ তাঁর জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়—প্রবাসে থেকেছেন, কিন্তু শিকড়কে ভুলে যাননি। অর্থ উপার্জন করেছেন, কিন্তু অর্থকে নিজের মধ্যে আটকে রাখেননি। নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারেননি, কিন্তু অন্যের স্বপ্ন পূরণের পথ তৈরি করেছেন। নিজের বাড়ি হয়নি, কিন্তু মানুষের জন্য এমন সব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন, যেখানে প্রতিদিন নতুন নতুন স্বপ্নের জন্ম হচ্ছে।

হয়তো তাঁর সবচেয়ে বড় বাড়ি কোনো শহরের অভিজাত এলাকায় নয়। তাঁর সবচেয়ে বড় ঠিকানা মানুষের হৃদয়ে। হয়তো তাঁর সবচেয়ে বড় সম্পদ কোনো ব্যাংক হিসাবে নেই। সেটি রয়েছে হাজারো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতে, অসংখ্য পরিবারের আশায়, এলাকার মানুষের ভালোবাসায় এবং তাঁর কাজের স্মৃতিতে।

এই কারণেই রাজনীতি ও সামাজিক পরিচয়ের বাইরে মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর আরেকটি পরিচয় সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে—তিনি একজন সমাজসেবক।

দল-মত, ধর্ম-বর্ণ ও শ্রেণির বিভাজনের বাইরে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে মানসিকতা তিনি দীর্ঘদিন ধরে ধারণ করছেন, সেটিই তাঁকে আলাদা করে। তাঁর জীবন হয়তো নিখুঁত নয়, তাঁর পথও ছিল না মসৃণ; কিন্তু তাঁর কাজের ভেতর দিয়ে যে মানবিকতার পরিচয় পাওয়া যায়, সেটিই তাঁকে মানুষের কাছে স্মরণীয় করে রাখছে।

একদিন মানুষ চলে যায়, কিন্তু মানুষের জন্য করা কাজ থেকে যায়। একটি বিদ্যালয়ের দরজা দিয়ে যখন কোনো দরিদ্র পরিবারের সন্তান উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখে, একটি বৃত্তি যখন কোনো শিক্ষার্থীর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সাহায্য করে, একটি হাসপাতালের জমিতে যখন অসুস্থ মানুষ চিকিৎসার সুযোগ পায়, একটি গ্রন্থাগারে যখন কোনো তরুণ বই হাতে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে—সেই প্রতিটি মুহূর্তের সঙ্গে একজন মানুষের ত্যাগও বেঁচে থাকে।

মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর গল্প তাই শেষ হওয়ার নয়। এটি চলমান একটি গল্প—মানুষের জন্য কাজ করার গল্প, শিকড়ের প্রতি দায়বদ্ধ থাকার গল্প এবং নিজের অর্জনকে অন্যের ভবিষ্যতের জন্য উৎসর্গ করার গল্প।

নিজের জন্য তিনি হয়তো প্রাসাদ গড়েননি। কিন্তু মানুষের জন্য তিনি যে প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা ও সম্ভাবনার ভিত গড়ে তুলেছেন, সময়ের সঙ্গে সেগুলোই হয়ে উঠতে পারে তাঁর সবচেয়ে বড় স্মারক।

আর সেই কারণেই তাঁর জীবনকে এক বাক্যে হয়তো এভাবেই বলা যায়—

নিজের জন্য নয়, মানুষের জন্য বেঁচে থাকার এক দীর্ঘ নাম—মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী।

রিপোর্টার admin ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩৬ অপরাহ্ন
৪৩ পঠিত