পে-স্কেলের সুফল সবার ঘরে পৌঁছাবে তো? বেসরকারি চাকরিজীবী, শ্রমিক ও দিনমজুরের আয় বৃদ্ধির নিশ্চয়তা কোথায়


joyjatra প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬, ৫:১৮ অপরাহ্ন / ৩০ পঠিত
পে-স্কেলের সুফল সবার ঘরে পৌঁছাবে তো? বেসরকারি চাকরিজীবী, শ্রমিক ও দিনমজুরের আয় বৃদ্ধির নিশ্চয়তা কোথায়

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন পুনর্নির্ধারণের দাবি ছিল। সেই দাবি বাস্তবায়ন নিঃসন্দেহে সরকারি কর্মচারীদের জন্য স্বস্তির খবর।

কিন্তু একটি রাষ্ট্রের অর্থনীতি শুধু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে গড়ে ওঠে না। দেশের অর্থনীতির বড় অংশ নির্ভর করে বেসরকারি চাকরিজীবী, কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিকসহ অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত বিপুল জনগোষ্ঠীর ওপর।

তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—

সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ল, কিন্তু বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়বে কীভাবে?

দিনমজুরের আয় বাড়বে কীভাবে?

কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়লেও তার আয় বৃদ্ধির নিশ্চয়তা কোথায়?

যে মানুষের কোনো নির্দিষ্ট বেতন স্কেলই নেই, তার জন্য রাষ্ট্রের পরিকল্পনা কী?

এই প্রশ্নগুলো এখন আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

সরকারি কর্মচারীদের জন্য পে-স্কেল আছে, নির্দিষ্ট গ্রেড আছে, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট আছে, বিভিন্ন ভাতা আছে। কিন্তু একজন দিনমজুরের ক্ষেত্রে এসবের কিছুই নেই। আজ কাজ থাকলে আয় আছে, কাজ না থাকলে আয় নেই। একজন বেসরকারি কর্মচারীর ক্ষেত্রেও সরকারি পে-স্কেলের মতো কোনো সর্বজনীন কাঠামো নেই।

অথচ বাজার সবার জন্য একই।

সরকারি কর্মচারী যে দামে চাল, ডাল, তেল, মাছ-মাংস কেনেন, দিনমজুরকেও একই বাজার থেকে একই পণ্য কিনতে হয়। সরকারি কর্মচারীর বাসাভাড়া বাড়লে যেমন সমস্যা, একজন নিম্নআয়ের মানুষের বাসাভাড়া বাড়লে তার জন্য সেটি আরও বড় সংকট।

এখানেই রাষ্ট্রের নীতির একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—আয় বৃদ্ধির সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয়ের ভারসাম্য কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?

সরকারি বেতন বাড়ার ফলে মানুষের হাতে অতিরিক্ত অর্থ আসবে। এতে বাজারে পণ্য ও সেবার চাহিদা বাড়তে পারে। উৎপাদন ও ব্যবসা বাড়লে এটি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। কিন্তু একই সময়ে যদি পণ্য ও সেবার সরবরাহ না বাড়ে, তাহলে বাড়তি চাহিদা মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে।

আর সেই মূল্যস্ফীতির চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভব করবেন নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষ।

কারণ সরকারি কর্মচারীর বেতন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একজন দিনমজুরের দৈনিক মজুরি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়ে না। একজন বেসরকারি কর্মচারীর বেতনও সরকারি সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হয় না।

অর্থাৎ এক শ্রেণির আয় বাড়ছে নিশ্চিতভাবে, অন্য শ্রেণির আয় বাড়বে কি না—তা অনিশ্চিত।

এই অনিশ্চয়তাই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।

আমরা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির বিরোধিতা করি না। বরং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মর্যাদাপূর্ণ বেতন পাবেন—এটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু একই সঙ্গে রাষ্ট্রকে ভাবতে হবে সেই মানুষটির কথাও, যার মাসিক বেতন নির্ধারিত নয়; যার কোনো ইনক্রিমেন্ট নেই; যার চাকরির নিশ্চয়তা নেই; যার অসুস্থতার দিনে আয় বন্ধ; যার বয়স হলে অবসরভাতা নেই।

তারপরও সে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে।

একজন কৃষক খাদ্য উৎপাদন করছেন। একজন নির্মাণশ্রমিক দেশের অবকাঠামো নির্মাণ করছেন। একজন রিকশাচালক নগরের মানুষের চলাচল সচল রাখছেন। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী স্থানীয় অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়ে রাখছেন। একজন বেসরকারি কর্মচারী শিল্প ও সেবা খাতকে সচল রাখছেন।

তাহলে তাদের আয় বৃদ্ধির প্রশ্নটি রাষ্ট্রীয় নীতির বাইরে থাকবে কেন?

পে-স্কেলের পাশাপাশি ‘জনগণের আয় স্কেল’ প্রয়োজন

সরকারের সামনে এখন একটি বড় সুযোগ রয়েছে। শুধু সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর মধ্যেই নীতিগত সাফল্য সীমাবদ্ধ না রেখে সাধারণ মানুষের আয় বৃদ্ধির একটি সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে।

বেসরকারি খাতে ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, শ্রমিকের ন্যূনতম আয় পুনর্নির্ধারণ, অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা বাড়ানো, কৃষকের উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ অর্থায়ন—এসব উদ্যোগ একই সঙ্গে নিতে হবে।

কারণ শুধু সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়িয়ে একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো সম্ভব নয়।

বরং রাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত—

যার আয় কম, তার আয় দ্রুত বাড়ানো।

যার আয় অনিশ্চিত, তার আয়কে নিরাপদ করা।

যার চাকরি অনিরাপদ, তার কর্মসংস্থান সুরক্ষিত করা।

এটাই হতে পারে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির প্রকৃত ভিত্তি।

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ছাড়া বেতন বৃদ্ধি কতটা কার্যকর?

আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে প্রকৃত আয় বাড়ে না।

ধরা যাক, কারও বেতন ২০ শতাংশ বাড়ল। কিন্তু একই সময়ে খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও পরিবহন ব্যয় যদি ২০ শতাংশের বেশি বাড়ে, তাহলে কাগজে-কলমে বেতন বাড়লেও বাস্তবে তার জীবনযাত্রার মান বাড়বে না।

তাই পে-স্কেলের সঙ্গে সঙ্গে বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, সিন্ডিকেট ও কৃত্রিম সংকট বন্ধ করা, উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানো এবং নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ করা জরুরি।

রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন থাকবেই

সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হবে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—

বেসরকারি চাকরিজীবীর বেতন কত বাড়বে?

দিনমজুরের দৈনিক মজুরি কত বাড়বে?

কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য কতটা নিশ্চিত হবে?

নিম্নআয়ের মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কীভাবে বাড়ানো হবে?

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির চাপ থেকে সাধারণ মানুষকে কীভাবে সুরক্ষা দেওয়া হবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত পে-স্কেল নিয়ে আলোচনা পূর্ণাঙ্গ হবে না।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি প্রয়োজনীয় হতে পারে; কিন্তু একটি কল্যাণরাষ্ট্রের সাফল্য কেবল সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন দিয়ে পরিমাপ করা যায় না।

রাষ্ট্রের প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন সরকারি কর্মকর্তা থেকে দিনমজুর—সবাই তার শ্রম ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্য পায়।

একজন সরকারি কর্মচারীর পরিবারের সন্তান যেমন ভালো শিক্ষা ও চিকিৎসার অধিকার রাখে, একজন দিনমজুরের সন্তানও সেই অধিকার রাখে।

একজন সরকারি কর্মচারী যেমন সম্মানজনক জীবন চান, একজন শ্রমিকও তেমনি সম্মান নিয়ে বাঁচতে চান।

সুতরাং পে-স্কেল হোক সবার জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক সংস্কারের সূচনা—শুধু একটি শ্রেণির আয় বৃদ্ধির সমাপ্তি নয়।

শেষ কথা

সরকারি কর্মচারীর বেতন বাড়ুক—এতে আপত্তি নেই।

কিন্তু একই সঙ্গে দেশের বেসরকারি কর্মজীবী, শ্রমিক, কৃষক, দিনমজুর ও নিম্নআয়ের মানুষের আয়ও বাড়াতে হবে।

কারণ যে অর্থনীতি শুধু একটি শ্রেণির আয় বাড়ায়, সেটি প্রবৃদ্ধি তৈরি করতে পারে; কিন্তু যে অর্থনীতি সাধারণ মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়ায়, সেটিই প্রকৃত অর্থে জনকল্যাণ নিশ্চিত করে।

আজ তাই সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন—

“সরকারি বেতন বাড়ল, এবার সাধারণ মানুষের আয় বাড়বে কবে?”

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে নতুন পে-স্কেল কতটা জনবান্ধব এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক।

রিপোর্টার joyjatra ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:১৮ অপরাহ্ন
৩০ পঠিত