রোহিঙ্গাদের মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জোরালো ভূমিকা প্রয়োজন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী


joyjatra প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬, ৫:১৭ অপরাহ্ন / ৩৩ পঠিত
রোহিঙ্গাদের মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জোরালো ভূমিকা প্রয়োজন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত ও টেকসই রাজনৈতিক সমাধানে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও জোরালো ও কার্যকর ভূমিকার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গা ইস্যু যেন কোনো বৈশ্বিক রাজনৈতিক সংকটের আড়ালে চাপা না পড়ে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সর্বদা অগ্রাধিকার পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

রোববার সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল কোঅপারেশন ফাউন্ডেশন (আইজিসিএফ) আয়োজিত ‘দ্য রোহিঙ্গা ক্রাইসিস: ইমার্জিং চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড রিফ্রেমিং রেসপনসিবিলিটিজ’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে ‘গেস্ট অব অনার’ হিসেবে বক্তব্য দেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ। তিনি রোহিঙ্গা ইস্যু মোকাবিলায় প্রশাসনিক সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব রাজনীতির নেতৃস্থানীয় দেশগুলোর প্রত্যক্ষ সহযোগিতা এবং জাতিসংঘের কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ ছাড়া রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। তিনি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, ইউএনএইচসিআর এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, “আমাদের মূল লক্ষ্য একটাই। আশ্রিত বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের পূর্ণ মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করে নিজ মাতৃভূমিতে ফিরিয়ে দেওয়া। এজন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত সহায়তা অত্যন্ত জরুরি।”

মন্ত্রী জানান, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। তবে ইউএনএইচসিআরের হিসাবে এ সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রায় নয় বছর ধরে বাংলাদেশ মানবিক বিবেচনায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয়, খাদ্য, চিকিৎসা, জমি এবং জীবনধারণের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে আসছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান, মানবপাচার, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।

তিনি বলেন, এসব কার্যক্রম বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য গুরুতর চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে ক্যাম্পসংলগ্ন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভারসাম্যও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ক্যাম্পের চারপাশে সীমান্ত বেড়া নির্মাণ এবং সুনিয়ন্ত্রিত যাতায়াত ব্যবস্থার মতো নিরাপত্তা পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ অতীতেও সফলভাবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্পন্ন করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৭৮ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে এবং ১৯৯২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কূটনৈতিক উদ্যোগে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল।

তিনি বলেন, সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার শতভাগ সফল ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর।

মন্ত্রী জানান, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় ইতোমধ্যে ‘ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ফর্মুলেশন কমিটি অন রোহিঙ্গা অ্যাফেয়ার্স’ গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও আন্তঃসংস্থার সমন্বয়ের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে আরেকটি উচ্চপর্যায়ের জাতীয় কমিটিও সক্রিয় রয়েছে।

তিনি বলেন, বেসামরিক প্রশাসন, নিরাপত্তা বাহিনী ও প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে সরকার ‘হোল অব গভর্নমেন্ট’ পদ্ধতিতে সমন্বিতভাবে কাজ করছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, সুনির্দিষ্ট প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি মানবিক সহায়তা রাজনৈতিক সমাধানের গতি কমিয়ে দিতে পারে। তাই কেবল জরুরি ত্রাণ নয়, এখন প্রয়োজন একটি কার্যকর ‘ট্রানজিশনাল স্ট্র্যাটেজি’।

তিনি বলেন, এ কৌশলের মূল লক্ষ্য হবে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে এমন একটি নিরাপদ ও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে ফিরে যেতে পারবেন।

গোলটেবিল আলোচনায় ইউএনএইচসিআরের বাংলাদেশ প্রতিনিধি আইভো ফ্রেইসেন, বিআইআইএসএসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ এস এম রিদওয়ানুর রহমান, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, শরণার্থী সেলের প্রধান ও যুগ্মসচিব মোহাম্মদ নাজমুল আবেদীন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী, ড. নিলয় রঞ্জন বিশ্বাস, আইইউবির অধ্যাপক ড. কাজী মাহমুদুল রহমান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. নুরুল হুদা সাকিব, ইউল্যাবের সহকারী অধ্যাপক অবন্তী হারুন, অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির এবং প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি রাহীদ এজাজসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে আইজিসিএফের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী আদনান রহমান স্বাগত বক্তব্য দেন। পুরো আলোচনা সঞ্চালনা করেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. বুলবুল সিদ্দিকী।

সমাপনী বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, জাতীয় ঐক্য, শক্তিশালী নিরাপত্তা কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের টেকসই অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের নিজ মাতৃভূমি মিয়ানমারে মর্যাদাপূর্ণ ও স্থায়ী প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে।

রিপোর্টার joyjatra ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:১৭ অপরাহ্ন
৩৩ পঠিত

জাতীয় বিভাগের আরো খবর

আরও খবর