ডলারের আধিপত্যে পরিবর্তনের আভাস, চীনের ডিজিটাল কূটনীতি ও বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা


joyjatra প্রকাশের সময় : অগাস্ট ৩০, ২০২৬, ৬:৪৫ অপরাহ্ন / ৩০ পঠিত
ডলারের আধিপত্যে পরিবর্তনের আভাস, চীনের ডিজিটাল কূটনীতি ও বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা

বিশ্ব অর্থনীতিতে ডি-ডলারাইজেশনের আলোচনা বাড়ছে, সামনে আসছে বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা

বিশ্ব অর্থনীতিতে কয়েক দশক ধরে মার্কিন ডলার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করে আসছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৪ সালের ব্রেটন উডস ব্যবস্থা ডলারের আন্তর্জাতিক ভূমিকা আরও শক্তিশালী করে। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে ডলারের সঙ্গে স্বর্ণের সরাসরি রূপান্তরযোগ্যতা শেষ হলেও মার্কিন অর্থনীতি, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি বাজারে ডলারের অবস্থান অটুট থাকে।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে একটি নতুন প্রবণতা স্পষ্ট হচ্ছে—ডি-ডলারাইজেশন বা ডলারের ওপর অতিনির্ভরতা কমানোর চেষ্টা।

রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং দেশটির বৈদেশিক সম্পদের একটি বড় অংশ আটকে দেওয়ার ঘটনা বিভিন্ন দেশকে বৈদেশিক রিজার্ভ ও আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ব্যবস্থার ঝুঁকি নতুন করে বিবেচনা করতে বাধ্য করেছে। রাশিয়ার ব্যাংকগুলোর SWIFT ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার সীমিত করার ঘটনাও বিকল্প আর্থিক অবকাঠামো তৈরির আলোচনাকে তীব্র করেছে।

এখানে একটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখা প্রয়োজন—ডলারের বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে মানেই ডলারের আধিপত্য অবিলম্বে শেষ হয়ে যাচ্ছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। বরং বাস্তবতা হলো, আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থা ধীরে ধীরে বহুমুদ্রাভিত্তিক ও বহুপ্ল্যাটফর্মভিত্তিক হওয়ার চেষ্টা করছে।

চীনের কৌশল: মুদ্রা নয়, তৈরি হচ্ছে বিকল্প অবকাঠামো

চীন এই পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। বেইজিংয়ের কৌশল শুধু ইউয়ানকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা নয়; বরং আন্তর্জাতিক লেনদেনের জন্য বিকল্প অবকাঠামো তৈরি করা।

এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো CIPS (Cross-Border Interbank Payment System)। এটি আন্তর্জাতিক আন্তঃব্যাংক লেনদেনে চীনা মুদ্রা বা ইউয়ানের ব্যবহার সহজতর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।

অন্যদিকে mBridge প্রকল্প আন্তর্জাতিক ডিজিটাল মুদ্রাভিত্তিক আন্তঃসীমান্ত লেনদেনের সম্ভাবনাকে সামনে এনেছে। প্রকল্পটির সঙ্গে চীনের পাশাপাশি হংকং, থাইল্যান্ড ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যুক্ত ছিল। এর লক্ষ্য ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবহার করে দ্রুত ও দক্ষ আন্তঃসীমান্ত লেনদেনের সম্ভাবনা পরীক্ষা করা।

অর্থাৎ, চীনের কৌশলের মূল বিষয়টি শুধু ‘ডলার বাদ দেওয়া’ নয়। বরং কোনো একটি দেশের আর্থিক অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করা।

স্বর্ণের মজুত ও বৈদেশিক রিজার্ভে বৈচিত্র্য

চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বর্ণের মজুত বাড়িয়েছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো বৈদেশিক রিজার্ভকে বিভিন্ন সম্পদে ছড়িয়ে দেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলা করা।

আন্তর্জাতিক রিজার্ভে ডলারের অংশও দীর্ঘমেয়াদে কমেছে। তবে ডলার এখনও বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক বাজারে এর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।

তাই বর্তমান পরিস্থিতিকে ডলারের ‘পতন’ বলার চেয়ে বিশ্ব রিজার্ভ ব্যবস্থায় ধীরে ধীরে বৈচিত্র্য বাড়ছে—এভাবে দেখা বেশি বাস্তবসম্মত।

BRICS ও স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের উদ্যোগ

BRICS সম্প্রসারণের ফলে বিশ্বের বড় অর্থনীতির একটি অংশ একই প্ল্যাটফর্মে এসেছে। জোটটির সদস্য ও অংশীদার দেশগুলোর মধ্যে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য এবং বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।

তবে এখানেও বাস্তবতা হলো—BRICS এখনো ডলারের সমতুল্য একটি একক বৈশ্বিক মুদ্রা বা পূর্ণাঙ্গ বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা তৈরি করতে পারেনি।

অর্থাৎ, ডলারকে রাতারাতি সরিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে বিকল্প তৈরি করার প্রক্রিয়াই এখন বেশি দৃশ্যমান।

বাংলাদেশের জন্য এর গুরুত্ব কোথায়?

বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হয়।

তাই বাংলাদেশের জন্য মূল শিক্ষা হওয়া উচিত—কোনো একটি বৈদেশিক মুদ্রা বা একটি পেমেন্ট চ্যানেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হওয়া।

১. বৈদেশিক রিজার্ভে বৈচিত্র্য

ডলার বাংলাদেশের রিজার্ভের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেই থাকবে। তবে অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও ঝুঁকি বিবেচনায় ইউরো, ইউয়ান, স্বর্ণসহ অন্যান্য সম্পদের ভূমিকা কতটা বাড়ানো যায়, তা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মিত পর্যালোচনা করা উচিত।

২. স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানো

ভারত, চীনসহ গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে যেখানে অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাজনক, সেখানে স্থানীয় মুদ্রায় দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে।

তবে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য মানেই ডলার পুরোপুরি বাদ দেওয়া নয়। বরং লক্ষ্য হওয়া উচিত বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি ও লেনদেন ব্যয় কমানো।

৩. ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো

বাংলাদেশের নিজস্ব ডিজিটাল মুদ্রা বা CBDC নিয়ে গবেষণা ও প্রস্তুতি আন্তর্জাতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এগিয়ে নেওয়া যেতে পারে। তবে এর সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা, গোপনীয়তা, ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও আর্থিক স্থিতিশীলতার বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব পেতে হবে।

৪. বিকল্প আন্তর্জাতিক পেমেন্ট চ্যানেল

বাংলাদেশের উচিত আন্তর্জাতিক পেমেন্ট অবকাঠামোর বৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণা করা। CIPS বা ভবিষ্যতের আন্তঃসীমান্ত CBDC প্ল্যাটফর্মগুলো বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিকভাবে উপযোগী কি না, তা পরীক্ষা করা যেতে পারে।

তবে কোনো প্ল্যাটফর্মে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হতে হবে ব্যবসায়িক সুবিধা, নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক আইন ও বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক স্বার্থ বিবেচনা করে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক: সুযোগ ও সতর্কতার জায়গা

বাংলাদেশের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে তৈরি পোশাক রপ্তানির জন্য যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম বড় বাজার।

সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য সম্পর্কের কাঠামো নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে, তা বাংলাদেশের জন্য যেমন বাজারসুবিধার সম্ভাবনা তৈরি করে, তেমনি কিছু শর্ত নিয়ে নীতিগত বিতর্কও তৈরি করেছে।

তবে কোনো বাণিজ্য চুক্তিকে শুধু ‘ডলারের ফাঁদ’ বা ‘সার্বভৌমত্ব হস্তান্তর’ হিসেবে দেখার আগে চুক্তির প্রতিটি ধারা, শুল্ক কাঠামো, Rules of Origin, বাজার প্রবেশাধিকার, নিষেধাজ্ঞা-সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা এবং বাংলাদেশের বাস্তব অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতি আইনগত ও অর্থনৈতিকভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

কারণ একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের সব ধরনের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক স্বাধীনতা বন্ধ করে দেয়—এমন সিদ্ধান্ত প্রমাণ ছাড়া দেওয়া ঠিক নয়।

বাংলাদেশের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ

বিশ্ব অর্থনীতি এখন একটি পরিবর্তনশীল পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ডলারের অবস্থান শক্তিশালী থাকলেও একই সঙ্গে বিকল্প মুদ্রা, স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং CBDC-ভিত্তিক আন্তঃসীমান্ত লেনদেন নিয়ে গবেষণা ও পরীক্ষা বাড়ছে।

এই পরিবর্তনের মধ্যে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো—

ডলারবিরোধী হওয়া নয়; বরং অর্থনৈতিকভাবে অতিনির্ভরশীল না হওয়া।

বাংলাদেশের প্রয়োজন একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল:

ডলার থাকবে → কিন্তু একমাত্র বিকল্প হিসেবে নয়।
SWIFT থাকবে → পাশাপাশি বিকল্প পেমেন্ট অবকাঠামোও পর্যবেক্ষণে থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য থাকবে → পাশাপাশি চীন, ভারত, ইউরোপ ও অন্যান্য বাজারও সম্প্রসারিত হবে।
ডিজিটাল টাকা আসবে → কিন্তু শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ও সাইবার নিরাপত্তার ভিত্তিতে।
রিজার্ভে ডলার থাকবে → পাশাপাশি সম্পদ ও মুদ্রার বৈচিত্র্যও বিবেচনায় থাকবে।

উপসংহার

বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তনকে শুধু ‘ডলারের রাজত্বের পতন’ হিসেবে দেখলে বিষয়টি অতিরঞ্জিত হবে। বরং আমরা এমন একটি সময়ে প্রবেশ করছি, যেখানে এককেন্দ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার পাশাপাশি বিকল্প আর্থিক অবকাঠামো ও বহুমুদ্রাভিত্তিক বাণিজ্যের গুরুত্ব বাড়ছে।

চীন এই পরিবর্তনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নিচ্ছে—CIPS, ডিজিটাল মুদ্রা, আন্তঃসীমান্ত পেমেন্ট প্রযুক্তি, স্বর্ণের মজুত এবং স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের মাধ্যমে।

বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা খুব পরিষ্কার:

বিশ্ব যখন বিকল্প তৈরি করছে, বাংলাদেশকেও বিকল্পের সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।

কোনো একটি দেশ, মুদ্রা কিংবা পেমেন্ট ব্যবস্থার ওপর অতি-নির্ভরতা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক, তথ্যনির্ভর ও ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক কূটনীতি।

বিশ্ব অর্থনীতি বদলাচ্ছে।
বাংলাদেশেরও প্রস্তুত হওয়ার সময় এখনই।

রিপোর্টার joyjatra ৩০ অগাস্ট ২০২৬, ০৬:৪৫ অপরাহ্ন
৩০ পঠিত

জাতীয় বিভাগের আরো খবর

আরও খবর