নীরব মানুষেরও একটি গল্প আছে


joyjatra প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ৩, ২০২৬, ১:৪৬ পূর্বাহ্ন / ৩৩ পঠিত
নীরব মানুষেরও একটি গল্প আছে

মানুষকে দেখে বিচার করা খুব সহজ। একটি হাসিমুখ দেখলেই আমরা ধরে নিই সে ভালো আছে। একটি সুন্দর পোশাক দেখলেই মনে করি তার জীবনে কোনো অভাব নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি দেখেই সিদ্ধান্ত নিই, মানুষটি নিশ্চয় সুখে আছে। অথচ বাস্তবতা অনেক ভিন্ন। সবচেয়ে গভীর কষ্টগুলো সাধারণত শব্দ করে না। সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধগুলোও নীরবেই লড়া হয়। এই সমাজে হাজারো মানুষ প্রতিদিন নিজের ভাঙা স্বপ্ন বুকে নিয়ে রাস্তায় বের হয়। কেউ পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। কেউ চাকরির আশায় বছরের পর বছর ঘুরে বেড়ায়। কেউ আবার নিজের ইচ্ছা, ভালোবাসা আর স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে শুধু পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করে। তাদের গল্প সংবাদ হয় না। তাদের কান্না ভাইরাল হয় না। কিন্তু তারাও মানুষ। তাদেরও একটি গল্প আছে। একজন বাবাকে দেখুন। তিনি হয়তো নতুন জামা কেনেন না, কিন্তু সন্তানের জন্য নতুন পোশাক নিয়ে ঘরে ফেরেন। একজন মা নিজের অসুস্থতা লুকিয়ে রাখেন, কারণ সংসারের খরচে ওষুধ কেনা কঠিন। একজন তরুণ রাত জেগে পড়াশোনা করে, পরীক্ষা দেয়, ব্যর্থ হয়, আবার শুরু করে। বাইরে থেকে সবাই তাকে শুধু ফলাফল দিয়ে বিচার করে। কেউ তার নির্ঘুম রাতগুলো দেখে না। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে মানুষ কথা বলার চেয়ে বিচার করতে বেশি ভালোবাসে। কারও ব্যর্থতা দেখলে উপহাস করি, ভুল দেখলে সমালোচনা করি, কিন্তু খুব কম মানুষ এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করি, “তুমি কেমন আছো?” এই একটি প্রশ্ন অনেক সময় একজন ভেঙে পড়া মানুষকে আবার বাঁচার সাহস দিতে পারে।

‎মানবিকতার সবচেয়ে বড় সংকট হলো, আমরা মানুষের অবস্থান দেখি, অবস্থা দেখি না। একটি পেশা, একটি পরিচয়, একটি রাজনৈতিক মত বা একটি সামাজিক অবস্থান দিয়ে পুরো মানুষটিকে মাপতে চাই। অথচ প্রতিটি মানুষের জীবনে এমন কিছু অধ্যায় থাকে, যা সে কাউকে বলতে পারে না। কিছু ক্ষত থাকে, যা চোখে দেখা যায় না। কিছু কান্না থাকে, যা জনসমক্ষে ঝরে না। সাংবাদিকতার পথ আমাকে একটি সত্য শিখিয়েছে। প্রতিটি সংবাদপত্রের শিরোনামের পেছনে একজন মানুষের জীবন থাকে। দুর্ঘটনার খবরের পেছনে থাকে একটি পরিবারের দীর্ঘশ্বাস। একটি আত্মহত্যার পেছনে থাকে অসংখ্য অজানা ব্যর্থতা। একটি অপরাধের পেছনেও কখনো কখনো থাকে অবহেলা, দারিদ্র্য আর ভাঙা সমাজব্যবস্থার ইতিহাস। তাই মানুষের গল্প না জেনে তাকে বিচার করা অন্যায়ের আরেক রূপ। আমাদের সমাজে শক্তিশালী হওয়ার সংজ্ঞাটাও বদলে গেছে। আমরা মনে করি যে কাঁদে না, সেই শক্তিশালী। অথচ সত্য হলো, যে শত কষ্টের পরও অন্যায়ের পথে যায় না, যে অপমান সহ্য করেও সততা ধরে রাখে, যে ভেঙে পড়েও আবার উঠে দাঁড়ায়, প্রকৃত শক্তিশালী মানুষ সে-ই। আজ আপনার আশেপাশে হয়তো এমন একজন মানুষ আছে, যে নীরবে সাহায্যের অপেক্ষায় আছে। হয়তো সে কিছুই চাইছে না, শুধু চায় কেউ তার কথা শুনুক। হয়তো সে হাসছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভেঙে যাচ্ছে। তাই মানুষের মুখ নয়, তার মন বোঝার চেষ্টা করুন। কারণ সহানুভূতি কখনো দুর্বলতা নয়। এটি সবচেয়ে বড় মানবিক শক্তি।একদিন আমরা সবাই গল্প হয়ে যাব। আমাদের পদবি, সম্পদ কিংবা ক্ষমতার চেয়ে মানুষ বেশি মনে রাখবে আমাদের ব্যবহার, আমাদের মানবিকতা আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস। তাই আসুন, বিচার করার আগে শুনি। সমালোচনার আগে বুঝি। আর নীরব মানুষগুলোর অপ্রকাশিত গল্পের প্রতি একটু সম্মান রাখি। কারণ পৃথিবীর প্রতিটি নীরব মানুষেরও একটি গল্প আছে। আর সেই গল্পের মূল্য অনেক সময় উচ্চস্বরে বলা হাজারো কথার চেয়েও বেশি।

লেখক: সাংবাদিক মোঃ শাহরিয়ার সিকদার 

রিপোর্টার joyjatra ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৪৬ পূর্বাহ্ন
৩৩ পঠিত